ভ্রমণ

সিলেট পানে: সাহস, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সফর


  • আবু সায়েম মোঃ সানাউল্লাহ  |
  • প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৬, ১৬:২৯
সিলেট পানে: সাহস, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সফর
ছবি: সাকিবা তাহসিন উপমা

২০১৫ সালের নভেম্বরের শুরুর দিক। তখন আমি সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। রোজকার মতোই জগন্নাথ হলের ছাদে আমরা ক'জন বন্ধু মিলে আড্ডায় মেতেছি। মৃদুমন্দ হাওয়া আর জ্যোৎস্নালোকে শোভিত সে রাত। আমাদের আসর থামতেই চাইছিল না। 

হঠাৎ সজিব বলে উঠল, "চল, কোথাও একটা ঘুরে আসি!"

প্রস্তাবটা যেন আমাদের সবার মনের কথা! 

সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নিলাম। এখনই বেরিয়ে পড়ব। গন্তব্য ঠিক হয়নি। এমনকি কী করব, না করব, সেটারও কোনো পরিকল্পনা নেই। তবুও কী এক অমোঘ টানে এই রাতে কোথাও বেরিয়ে পড়তেই হবে আমাদের। যে যার হলে ছুটলাম ব্যাগ আনতে। আমি গেলাম সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে আমার রুমে। ঢুকেই হাতের কাছে যা পেলাম, তাই নিয়েই দিলাম ছুট টিএসসিতে। সবাই সেখানে জড়ো হবে।

টিএসসিতে বসলাম সবাই। টের পেলাম, আমাদের কারও পকেটের অবস্থাই সুবিধাজনক নয়। কিন্তু আমরা দমে যাওয়ার পাত্র নই। সোজা হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুদূর হাঁটার পরই দেখি একটি মালবাহী ট্রাক আসছে। সাহস জুটিয়ে ট্রাকটাকে থামিয়ে ড্রাইভার আঙ্কেলকে আমাদের ইচ্ছের কথা বলতেই তিনি মুচকি হেসে সম্মতি দিলেন, "উঠে পড়ো।"

ট্রাকের পেছনে চড়ে কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছালাম। দেখি, সিলেটগামী একটি ট্রেন ছাড়বে অল্প সময়ের মধ্যেই। টিকিটের ব্যবস্থা করার সুযোগ নেই। দেরি না করে সোজা ট্রেনে। ট্রেনে উঠে জানালার পাশে বসে দিগন্তবিস্তৃত অন্ধকার রাত আর বাতাসের ঝাপটায় মিশে গেলাম। কিছুক্ষণ পর টিটি এসে টিকিট চাইলেন। আমাদের অসহায় অবস্থার কথা শুনে সহানুভূতির চোখে তাকালেন। বিরক্ত না হয়ে বরং আমাদের ট্রেনের মসজিদের কামরায় বসে থাকতে বললেন। পরে আবার নিজেই আমাদের খাবারের বগিতে নিয়ে গিয়ে চা আর বিস্কুট খাওয়ালেন।

সেই রাতে ট্রেনের ঝিকঝিক, আমাদের গিটারের ঝংকার আর গানে মুখর হয়ে উঠেছিল ট্রেনের কোচ। টিটি আঙ্কেলও আমাদের সঙ্গে গলা মেলালেন। জানলাম, তাঁর ছেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমাদের দেখে নিজের ছেলের কথা মনে পড়ায় তিনি এতটা যত্ন করেছিলেন। রাতভর গান আর গল্পে কাটল দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা। ভোরের আলোয় পৌঁছালাম সিলেটে।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়লাম বাস্তব সমস্যায়। থাকব কোথায়? ক্যাম্পাসের এক বন্ধুর কথা মনে পড়ল। ওর বাসা সিলেটে। মুঠোফোনে একবারেই পাওয়া গেল। সব গল্প শুনে এক মুহূর্তও দেরি না করে ছোট একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দিল। নামমাত্র ভাড়ায় সেখানে থাকার সুযোগ হলো।

একটু বিশ্রাম নিয়ে দুপুরে বেরিয়ে পড়লাম সিলেট শহর ঘুরতে। প্রথমে গেলাম হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে। মাজারের শান্ত পরিবেশে বসে মনে হলো, এই সফরের শুরুটাই যেন আশীর্বাদপুষ্ট! এরপর হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম কিন ব্রিজের কাছে। সুরমা নদীর জলরাশি আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পরিবেশ যেন মনকে অপার্থিব করে তুলছিল।

বন্ধুরা মিলে সকালে ভাগাভাগি করে খেয়েছিলাম পরোটা আর চা। বিকেলে নদীর পাড়ে বসে হাতে থাকা সামান্য টাকায় চানাচুর আর পানি কিনে খেলাম। সেই চানাচুর আর পানির স্বাদেই যেন আনন্দ ছিল অফুরন্ত। সন্ধ্যায় স্থানীয় এক ভাই আমাদের গল্প শুনে চা আর পিঠা খাওয়ালেন। তাঁর এই ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় হৃদয় ভরে গেল।

এরপর রাতের খাবারের ব্যবস্থা করল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বন্ধু। স্থানীয় এক রেস্টুরেন্টে গিয়ে পেটপুরে খেলাম ভাত, ডাল আর মুরগির মাংস। খাওয়া শেষে ফিরে এলাম হোটেলে। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়েও রাতভর চলল হাসি, গল্প আর গান।

পরদিন সকালে হালকা নাস্তা করে বেরিয়ে পড়লাম পাহাড়ের দিকে। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারলাম, কাছেই ছোট একটি ঝরনা আছে। পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম সেখানে। ঝরনার ঠান্ডা পানিতে পা ডুবিয়ে বসে সমস্বরে গান ধরলাম, "এই পথ যদি না শেষ হয়..."

ঝরনার পাশে বিকেল কাটিয়ে ফিরতে ফিরতে চা, ভাজা ভুট্টা আর নারকেলের মিষ্টি খেলাম।

সিদ্ধান্ত হলো, আজ রাতে ঢাকার পথে ফিরব।

ফেরার যাত্রা ছিল একেবারে ভিন্ন। স্টেশনে গিয়ে দেখি, ট্রেনে ওঠার সুযোগ নেই—না টিকিট আছে, না অত টাকা! তখন ঠিক করলাম, মালবাহী ট্রাক ধরেই ফিরব। স্টেশন থেকে কিছুটা হেঁটে বড় রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ঢাকাগামী একটি মালবাহী ট্রাক পেয়ে গেলাম। সাহস করে ড্রাইভার আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি হাসিমুখে বললেন, “সমস্যা নাই ভাই, চলো, উঠে পড়ো।”

ট্রাকের পেছনে মালপত্রের মাঝে বসে শুরু হলো আমাদের ঢাকায় ফেরা। আকাশভর্তি তারা, রাতের ঠান্ডা বাতাস আর থেকে থেকে আলো-ছায়ার খেলা—সব মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নের মুহূর্ত। এরই মাঝে ড্রাইভার আঙ্কেল ট্রাক থামিয়ে আমাদের জন্য চা আর পানি নিয়ে এলেন। তাঁর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ট্রাকের দুলুনিতে কখনো গান গাইছিলাম, কখনো চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকছিলাম। মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে স্বাধীন, সবচেয়ে খাঁটি মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে আছি।

ভোররাতে ট্রাক ঢাকায় পৌঁছাল। পলাশী মোড়ে নামলাম। শরীর ক্লান্ত হলেও মনে এক অপার সুখ নিয়ে যে যার হলে চললাম। পকেটে টাকা ছিল না, থাকার নিশ্চয়তা ছিল না, অথচ হৃদয়ে ছিল বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর সাহসের অফুরন্ত ভাণ্ডার।

এখনও হঠাৎ সে সফরের কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর নরম এক আলো জ্বলে ওঠে।


ক্যাটাগরি: ভ্রমণ

         

  রেটিং: ৩.৩

এই বিভাগের আরও পোস্ট

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।